তেঁতুলিয়া মুক্তাঞ্চল - Tetulia Muktanchal

সমগ্র বাংলাদেশব্যপী পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যাপক আক্রমণে ১৯৭১-এর এপ্রিল নাগাদ সংগ্রামরত মানুষের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। পাকিস্তানি বাহিনী প্রতিটি জেলা, মহকুমা ও থানা সদরে আক্রমণ চালায়। বাংলাদেশের ছাত্র, যুবক, কৃষক, শ্রমিক, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী তথা সর্বস্তরের মানুষ বাধ্য হয়ে দেশ ত্যাগ করে ভারতের সীমান্তবর্তী ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে শরণার্থীরূপে আশ্রয় গ্রহণ করা শুরু করে।

পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা, নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞ দৃঢ় করার লক্ষ্যে দেশের জেলা ও থানা পর্যায়ে ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করে। তবে উত্তাল মার্চ থেকে শুরু করে বিজয় অর্জনের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশের বিশেষ কয়েকটি অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনী প্রবেশ করতে পারেনি এবং তাদের এদেশীয় দোসররাও কোনো কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেনি। এসব অঞ্চলই মুক্তাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধের মুক্তাঞ্চলসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য তৎকালীন দিনাজপুর জেলার ঠাকুরগাঁও মহকুমার তেঁতুলিয়া থানা (বর্তমানে পঞ্চগড় জেলাধীন তেঁতুলিয়া উপজেলা)।

মুক্তিযুদ্ধের সময় দিনাজপুর জেলার ঠাকুরগাঁও মহকুমার অন্যান্য থানার মধ্যে অন্যতম দুটি থানা ছিল পঞ্চগড় ও তেঁতুলিয়া। এই দুই থানা মিলে সত্তরের জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনী এলাকা ছিল একটি। একজন এমএনএ ও একজন এমপিএ প্রতিনিধি ছিল দুই থানার নির্বাচনী এলাকায়। আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত এমএনএ ছিলেন মোশাররফ হোসেন চৌধুরী ও এমপিএ ছিলেন কমরুদ্দিন আহমেদ মোক্তার।

দুটি থানা মিলে একটি আসন হলেও পঞ্চগড় থেকেই রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হতো। অসহযোগ আন্দোলনে পঞ্চগড়ে যে সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয় তাতে সভাপতি ছিলেন কমরুদ্দিন আহমেদ মোক্তার ও সম্পাদক ছিলেন অ্যাডভোকেট বশিরুল আলম। অন্যান্য নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন মোশাররফ হোসেন ও ঞ্চগড়ের রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রাণপুরুষ, বর্ষীয়ান নেতা, মহান একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের দক্ষ সংগঠক অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম। তেঁতুলিয়া মুক্তাঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবার সময় থেকে অগ্রগণ্য হিসেবে মুক্তাঞ্চল ছেড়ে কখনও অন্যত্র যাননি অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম। যদিও তিনি ছিলেন ঠাকুরগাঁও আংশিক, দেবীগঞ্জ ও আটোয়ারীর সমন্বয়ে গঠিত প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধি। 

পঞ্চগড়ের সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন নাজিমুদ্দিন আহমদ ও সম্পাদক ছিলেন এস. এম. লিয়াকত আলী। তেঁতুলিয়ার সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক নির্বাচিত হন থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী হবিবুর রহমান এবং সম্পাদক নির্বাচিত হন থানা আওয়ামী লীগের সম্পাদক আব্দুল জব্বার। কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ ও আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন কামরুল হোসেন, কামু, নাজির হোসেন, খুরশিদ আলম, আলম আকবর, আইয়ুব আলী, হাসান আলী, লুৎফর রহমান, খাদেম আলী, ওয়াহিদ হোসেন প্রমুখ। আর ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্র লীগের নেতৃবন্দসহ যুব নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন সুলতান আলম, কাজী মাহবুবুর রহমান, জহুরুল হক, মমতাজ উদ্দীন, শফিউদ্দিন সিদ্দিকী, আবুল হোসেন, আবুল কালাম আজাদ, আবদুল মান্নান, কাজী ফারুক আজম, আতাউর রহমান, জাহিদুল হক, ইয়াছিন আলী, ফজলুল হক, নাইবুল ইসলাম, আতিয়ার রহমান প্রমুখ।

ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় পতনের সঙ্গে সঙ্গেই মুক্ত এলাকা তেঁতুলিয়ায় রংপুর, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও থেকে পিছুহটা বিপুল সংখ্যক আনসার, মুজাহিদ, ইপিআর, সেনা-নৌ এবং বিমানবাহিনীর সদস্য উপস্থিত হন। তাঁদের সঙ্গে সামরিক-আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের পরিবারের পাশাপাশি প্রায় ২০ হাজার শরণার্থীর উপস্থিতি ঘটে মুক্তাঞ্চল অঞ্চলে। পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও থেকে ১০৬ টি ইপিআর পরিবারকে নিরাপত্তার জন্য প্রথমে তেঁতুলিয়া এবং সেখান থেকে বাংলাবান্ধা পাঠানো হয়। তবে বাকি সাধারণ জনগণ, সরকারি কর্মচারী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তাঁদেরকে তেঁতুলিয়ার বিভিন্ন বাড়ি ও প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় দেয়া হয়। আশ্রয়ের পাশাপাশি তাঁদেরকে নিয়মিত রেশন দেয়ার ব্যবস্থাও করা হয়।

১৯ এপ্রিল পঞ্চগড় পতনের পর সুবেদার মেজর কাজিম উদ্দিন তাঁর দলের ইপিআরদের সঙ্গে নিয়ে তেঁতুলিয়ায় অবস্থান নেন। অবশ্য এর আগে তাঁর নেতৃত্বে ২৮ মার্চ তারিখে ঠাকুরগাঁও শহরের তৎকালীন ইপিআর ক্যাম্পের বিদ্রোহ ও ক্যাম্প দখলকে কেন্দ্র করে মুক্তিকামী জনগণের মধ্যে সংগ্রামের চেতনা জন্ম নিয়েছিল। কেননা, ২ এপ্রিল তারিখে কাজিম উদ্দিন তাঁর প্রাক্তন পাকিস্তানি কমান্ডিং অফিসার অবসরপ্রাপ্ত মেজর এ.টি. হোসেন মুক্তিকামী যোদ্ধাদের সাথে একত্রে কাজ করতে চাইলে তিনি দায়িত্ব পান এবং সম্মুখযুদ্ধে যোগ দেন। পরবর্তী দিনাজপুর-সৈয়দপুর সড়কের উপর ৪ এপ্রিল ভূষিরবন্দর, ৫ এপ্রিল সৈয়দপুর-নীলফামারী সড়কের পাশে ও দারোয়ানীতে প্রতিরক্ষাব্যূহ গড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মোকাবিলার কাজ চলে, যা ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত কার্যকর ছিল। ২০ এপ্রিল করতোয়া নদীর তীর ঘেঁষে ভজনপুরে সুবেদার হাফিজ ও সুবেদার আহমদ হোসেন একদল ইপিআর নিয়ে স্থানীয় জনতার সহযোগিতায় ডিফেন্স গড়ে তোলেন। 

অসহযোগ আন্দোলন থেকেই পঞ্চগড় অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ সাধারণ জনতার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। ১৯ এপ্রিলের পর তাঁদের ভূমিকা পালন আরও গুরুত্ববহ হয়ে ওঠে। এপ্রিলের শেষের দিকে তেঁতুলিয়া মুক্তাঞ্চলে নিম্নোক্ত ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে গঠন করা হয় স্থানীয় প্রতিরোধ কমিটি (Local Defense Committee):

১. অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম এমপিএ (সভাপতি)
২. কমর উদ্দিন আহমেদ মোক্তার (সহ-সভাপতি)
৩. ফজলুল করিম এমপিএ (ঠাকুরগাঁও)
৪. অ্যাডভোকেট আজিজার রহমান (সহ সভাপতি, দিনাজপুর)
৫. ডা. শেখ ফরিদ আহমেদ (সেক্রেটারি)
৬. আলী মর্তুজা (জয়েন্ট সেক্রেটারি)
৭. কাজী হবিবুর রহমান (তেঁতুলিয়া)
৮. আবদুল জব্বার (তেঁতুলিয়া)
৯. আইয়ুব আলী (তেঁতুলিয়া)
১০. ডা. আতিয়ার রহমান (তেঁতুলিয়া)
১১. আকবর হোসেন (ঠাকুরগাঁও)
১২. আবদুর রশিদ মোক্তার (ঠাকুরগাঁও)
১৩. আবদুল লতিফ মোক্তার (ঠাকুরগাঁও)
১৪. অধ্যাপক আফতাব (ঠাকুরগাঁও)
১৫. অ্যাডভোকেট আবুল হাশেম (ঠাকুরগাঁও)
১৬. অ্যাডভোকেট আব্দুর রউফ (ঠাকুরগাঁও)
১৭. সুবেদার মেজর কাজিমউদ্দিন (ইপিআর)
১৮. নায়েব সুবেদার আবুল হাসেম (ইপিআর)
১৯. নায়েব সুবেদার মতিয়ার রহমান (ইপিআর)
২০. নায়েব সুবেদার হাফিজ উদ্দিন (ইপিআর)
২১. সুবেদ আলী ভূঁইয়া (ইপিআর) ও প্রমুখ

উপরোক্ত কমিটি সক্রিয়ভাবে পরিচালনা করার লক্ষ্যে একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়। উপদেষ্টা কমিটি তেঁতুলিয়া থানার সমস্ত অস্ত্র তাঁদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে এবং স্থানীয়ভাবে যুবকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা ও ভারতে যুবকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার উদ্দেশ্যে একটি রিক্রুটিং ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।

তেঁতুলিয়ার মুক্তাঞ্চল গড়ে উঠার শুরুতে অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম, আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল জব্বার এবং তেঁতুলিয়ার তৎকালীন সিও (ডেভ) মতিউর রহমান প্রথম থেকেই জনপ্রশাসন বা সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন চালু রাখার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। সিও (ডেভ) মতিউর রহমান সর্বপ্রথম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতি তাঁর আনুগত্য প্রকাশ করে ডিকলারেশন ফরমে স্বাক্ষর করেছিলেন ও তাঁর অফিসের সকলকে সেই ফরমে স্বাক্ষর করার নির্দেশ দেন। সে সময় তেঁতুলিয়া থানার মোট ৫৬ জন কর্মচারীর মধ্যে ৫৪ জন কর্মকর্তা/কর্মচারী আনুগত্য স্বীকার করে পরবর্তী বেতন প্রাপ্তির আবেদন জানান। বাংলাদেশের প্রথম সরকারের আনুগত্য যেসব সরকরি কর্মকর্তা ও কর্মচারী স্বীকার করেছিলেন, তাঁদের নাম নিম্নে উল্লেখ করা হলোঃ

১. এস.এম. মতিউর রহমান, সিও (উন্নয়ন)
২. সুশীলচন্দ্র দাস, সিও (উন্নয়ন) সহকারী
৩. নাজিমউদ্দিন, সিও (উন্নয়ন) সহকারী
৪. রহমান, সুপারভাইজার, সিও (উন্নয়ন)
৫. মজিদ উদ্দীন, সিও (রাজস্ব) অফিস
৬. আবদুল হালিম, সহকারী, সিও (রাজস্ব) অফিস
৭. সাইদুর রহমান, তহশিলদার
৮. আবদুল খালেক, তহশিলদার
৯. আজিজ উদ্দীন, উপ-সহকারী প্রকৌশলী, সওজ
১০. মশিউদ্দীন, কৃষি বিভাগ ও প্রমুখ

এ সময় জনপ্রশাসন চালু ও মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে কার্যক্রম চালু করেন অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দসহ মতিউর রহমান সিও (ডেভ)। তাঁরা মুক্তাঞ্চলকে পরিকল্পনামাফিক পরিচালনা এবং কার্যক্রম গতিশীল করার লক্ষ্যে  নিম্নোক্ত নীতি-নির্ধারণী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

ক. মুক্ত এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা।
খ. তেঁতুলিয়া থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের বাছাই করার জন্য প্রাথমিক ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করা ও শরণার্থী শিবির থেকে যুবকদের সংগ্রহ করে নিয়ে আসা।
গ. মুক্তিযোদ্ধাদের যাতে কোনো খাদ্যঘাটতি না পড়ে তার ব্যবস্থা করা।
ঘ. চুরি-ডাকাতি-রাহাজানি যাতে না হয় সে ব্যবস্থা করা।
ঙ. মুক্ত এলাকায় মানুষের মনে আস্থা, মনোবল, সাহস ও দেশপ্রেম জাগ্রত রাখা।
চ. মুক্তিযোদ্ধাদের যাতায়াতের জন্য যানবাহনের ব্যবস্থা সচল রাখা।
ছ. মুক্ত এলাকায় বিভিন্ন গুদামে রক্ষিত খাদ্যদ্রব্য ও কৃষিজ সামগ্রীর হেফাজত করা।
জ. অবরুদ্ধ এলাকার খবরাখবর প্রাপ্তিতে গোপন ব্যবস্থা করা।
ঝ. ভারত থেকে সহজ উপায়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য-সামগ্রী এনে তা বাজারজাত করণের ব্যবস্থা করা।
ঞ. ভারতীয় বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রাপ্ত ও প্রাপ্য সাহায্য সামগ্রীর সুষ্ঠু সংরক্ষণ ও বিতরণের ব্যবস্থা করা।
ট. তথ্য ও সংবাদ প্রেরণের জন্য ডাক চলাচলের ব্যবস্থা করা।
ঠ. এলাকার সব মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থী শিবির থেকে সংগ্রহ করা যুবক ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের যথাযথ তালিকা প্রণয়ন করা।
ড. ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তাঞ্চল দেখতে আসা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক, সরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সমাজকর্মী ও দর্শনার্থীদের অভ্যর্থনাসহ যথাযথ তথ্য প্রদানের ব্যবস্থা করা।

২৫ মার্চের পর যেসব ইপিআর ক্যাম্পগুলোতে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে সে ক্যাম্পগুলোর মধ্যে ব্যতিক্রম ছিল তেঁতুলিয়ার বিওপি, ইপিআর ক্যাম্পগুলো। তেঁতুলিয়ায় অবাঙালি ইপিআরদের কোনো প্রভাবই বাঙালি ইপিআর-এর ওপর বিস্তার করতে পারেনি। বরং স্থানীয় আন্দোলনরত সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ ও ছাত্র-জনতার সহযোগিতায় বাঙালি ইপিআররা তেঁতুলিয়ার সবকটি বিওপির অবাঙালি ইপিআরদের হত্যা করতে সমর্থ হয়েছিল। সময় তেঁতুলিয়ার মুক্তিযুদ্ধ সমর্থিত সামরিক শক্তির সংখ্যা ছিল ৯৯২ জন।

অমরখানার চাওয়াই নদীর অমরখানা ব্রিজের পাশে ১৯৭১ মুক্তাঞ্চল ফলক নামে স্বাধীনতার স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে।

তেঁতুলিয়া প্রবেশের মুখে প্রথমেই রয়েছে চাওয়াই নদী। এ নদী পার হয়ে প্রায় ২ কিমি দূরে আবার করতোয়া নদী। করতোয়ার পশ্চিমপাড় সংলগ্ন ভজনপুর থেকে তেঁতুলিয়ার দূরত্ব প্রায় ১৫ কিমি। ভারতীয় সীমান্ত থেকে প্রতি আক্রমণের ভয়ে এবং চাওয়াই ও করতোয়া পার হয়ে তেঁতুলিয়া প্রবেশ করে আক্রমণ চালিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে তেঁতুলিয়া টিকিয়ে থাকা সম্ভব ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভকালে পঞ্চগড় সদর উপজেলার অমরখানার চাওয়াই নদীর সেতুর পশ্চিম পার্শ্বের কিছু অংশ ডিনামাইট দিয়ে গুঁড়িয়ে দেন মুক্তিযোদ্ধারা। এ কারণে সড়কপথে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন তেঁতুলিয়ায় যেতে পারেনি পাকিস্তানি বাহিনী। ফলে পাকিস্তানি বাহিনী পঞ্চগড়ে তাদের শক্ত অবস্থান তৈরি করার পর চাওয়াই নদীর তীরবর্তী অমরখানা নামক জায়গাতেই উত্তরাঞ্চলের সর্বশেষ ঘাঁটি স্থাপন করে। আর মুক্তিযোদ্ধারা নদীর পশ্চিম তীর সংলগ্ন ভজনপুর এলাকায় তাঁদের ডিফেন্স গড়ে তুলে। …আরো পড়ুন একাত্তর মুক্তাঞ্চল ফলক | পঞ্চগড় মুক্তাঞ্চল পার্ক

মুক্তিযুদ্ধ সু-সংগঠিতভাবে পরিচালনার জন্য ১১টি সেক্টর গঠন করা হলে, ৬ নম্বর সেক্টরের এলাকা নির্ধারণ করা হয় বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর জেলার অংশ বিশেষ। উল্লেখ্য যে, একমাত্র ৬ নম্বর সেক্টরের সদর দপ্তর ও সাব-সেক্টরসমূহ দেশের মাটিতে গড়ে উঠেছিল। ৬ নম্বর সেক্টরের হেড কোয়ার্টারঃ বুড়িমারী, পাটগ্রাম (লালমনিরহাট মহকুমার থানা); সেক্টর কমান্ডারঃ উইং কমান্ডার মোহাম্মদ খাদেমুল বাশার (জুন থেকে ডিসেম্বর)। যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার্থে এই সেক্টরকে ৫টি সাব-সেক্টরে ভাগ করা হয়। তেঁতুলিয়া ভজনপুর এলাকায় গড়ে ওঠে ১ নং সাব-সেক্টর। সাব-সেক্টরের এলাকা নির্ধারণ করা হয়ঃ ময়নাগড়, জগদলহাট (চাওয়াই নদী পর্যন্ত), বোদা, অমরখানা, তেঁতুলিয়া ইত্যাদি। সাব-সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেনঃ ক্যাপ্টেন নজরুল হক, স্কোয়াড্রন লিডার সদর উদ্দিন, ক্যাপ্টেন সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান (তিনি পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসেছিলেন)। 

তেঁতুলিয়া মুক্তাঞ্চলের ভৌগোলিক গুরুত্বঃ তেঁতুলিয়া বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের সীমান্তবর্তী অঞ্চল। তেঁতুলিয়ার ভৌগোলিক সীমানা এরকমই যে, এর পশ্চিমে ভারত, উত্তরে ভারত, দক্ষিণে ভারত, কেবল দক্ষিণ-পূর্বে বঙ্গোপসাগরের অবস্থান। ফলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর তেঁতুলিয়া প্রবেশের জন্য একটি মাত্র পথই খোলা ছিল– তা হলো পঞ্চগড় হয়ে অগ্রসর হওয়া। তেঁতুলিয়া মুক্তাঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠার ক্ষেত্রে ভৌগোলিক পরিবেশ ছিল তার অনুকূলে। পঞ্চগড় থেকে তেঁতুলিয়ার দিকে যে রাস্তাটি অগ্রসর হয়েছে তার উত্তর দিকে খুব কাছেই ভারতের সীমান্ত, দক্ষিণ দিকেও ভারতের সীমান্ত বেশি দূরে নয়।

অবস্থানগত দিক থেকে ৬ নম্বর সেক্টর তথা বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের এই অঞ্চলটি ছিল চীন, ভুটান ও নেপাল সীমান্তের নিকটে। ভারতের পূর্বাঞ্চলের ৭টি প্রদেশ পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয়, মিজোরাম, আসাম, ত্রিপুরা, মনিপুর, নাগাল্যান্ড প্রভৃতির সঙ্গে কেন্দ্রের ছিল যোগাযোগের একমাত্র উপায় শিলিগুড়ি করিডোর, যা পঞ্চগড়ের খুবই নিকটে অবস্থিত। এই করিডোর কোনো কারণে হাতছাড়া হলে ভারতের সমগ্র পূর্বাঞ্চল কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। একদিকে পাকিস্তানের বন্ধু অন্যদিকে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র চীনের সীমান্ত এখানকার খুবই নিকটবর্তী হওয়ায় এবং সীমান্তে চীনের সেনা অবস্থান ভারতকে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন করেছিল। অন্যদিকে, পাকিস্তানও ঠিক একই কারণে এ অঞ্চলে যথেষ্ট সেনাশক্তি মোতায়েন করেছিল।

তেঁতুলিয়ার বর্ধিতাংশের তিন দিকেই ভারতীয় সীমানা। ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এখানে ছিল অনুকূল পরিবেশ। এ সাব-সেক্টরের হেড কোয়ার্টারও ছিল ভারতীয় সীমান্তের কাছাকাছি। তেঁতুলিয়ার সীমান্তের খুব নিকটেই ছিল চীনের সীমানা। খবর রটেছিল যে, চীন পাকিস্তানের সাহায্যার্থে তেঁতুলিয়া-পঞ্চগড়ের এই পথ ধরেই অগ্রসর হচ্ছে। সেটা যাতে কোনো মতেই বাস্তবায়িত হতে না পারে সেজন্য ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী প্রথম সুযোগেই এ অঞ্চলকে আয়ত্তে নিয়ে আসার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। যুদ্ধের শুরু থেকেই মুক্তিবাহিনী এখানে যথেষ্ট দাপটের সঙ্গে পাকিস্তানিদের মোকাবেলা করেছে। যৌথবাহিনীর চূড়ান্ত অভিযানের সময়েও তেঁতুলিয়া-পঞ্চগড়-ঠাকুরগাঁও-দিনাজপুরের পথ ধরেই পাকিস্তানিদের প্রতি আক্রমণটি করা হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধকালীন মুক্তাঞ্চল জীবনযাত্রাঃ সাব-সেক্টর তেঁতুলিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাসহ সর্বস্তরের মানুষের সহবস্থান ছিল। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তেঁতুলিয়ার পরিবেশ-পরিস্থিতি শান্ত থাকায়, স্থানীয়দের কারও মনে ভয় ভীতি ছিল না। মাঝেমধ্যে বোমার শব্দ শোনা যেত, তাঁরা রেডিওতে মুক্তিযুদ্ধের খবর শুনতো, তেঁতুলিয়ার সড়কে দেখতো মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র হাতে চলাফেরা আর যুদ্ধের গাড়ি যাতায়াত। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তাঞ্চলের কোনো বাসিন্দার মনে ভয় ছিল না, তবে সকলে ওয়াকিবহাল ছিল দেশজুড়ে পাকিস্তানিদের বর্বরতার। স্থানীয়রা বুঝতো, কোনো বড় পরিবর্তন আসছে কোথাও। মুক্তিযুদ্ধের জন্য অনেকের সঙ্গে মিছিলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান তুলতো সাধারণ মানুষ। প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে বসে রেডিওতে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ভাষণ শুনে বলেছিলেন, ‘তার বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছে, পাকিস্তানিদের মনোবল ভেঙে গিয়েছে। ফলে জয় সুনিশ্চিত। ভাইয়েরা, আপনারা কেউ মনোবল হারাবেন না’।

তেঁতুলিয়া মুক্তাঞ্চলে সড়ক ও রেল উভয় পথই যোগাযোগ উপযোগী ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরো ৯টি মাস তেঁতুলিয়া থেকে ভজনপুর পর্যন্ত একটি বাস চলাচল করেছে। মার্চ মাস নাগাদ স্বাধীনতা যুদ্ধের গতি ও হিংস্রতা বাড়লে পাকিস্তান সরকার বাধ্য হয়ে বাসটি বন্ধ করে দিলেও তেঁতুলিয়া থেকে বাংলাবান্ধা পর্যন্ত প্রবাসী সরকারের উদ্যোগে আবার বাস সার্ভিস চালু করা হয়। ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মুক্তাঞ্চলটির জীবন ছিল স্বাভাবিক। তাঁরা বিয়ে, সন্তানের খৎনা, আকিকাসহ সব ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান করেছেন। হাট-বাজারে কেনাবেচা হয়েছে। তেঁতুলিয়ার শালবাহানে নিয়মিত বড় বাজারের হাট বসেছে। বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের মুদ্রায় কেনা-কাটা হয়েছে।

মুক্তাঞ্চলে দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বঃ মুক্তিযোদ্ধাসহ স্বাধীনতাকামী জনতার জন্য মুক্তাঞ্চল ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই গুরুত্বপূর্ণ স্থান পরিদর্শন এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করার জন্য এসেছেন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও ভারতের বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ।

(ক) ৯ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচএম কামারুজ্জামান উত্তরাঞ্চল পরিদর্শনকালে তেঁতুলিয়া মুক্তাঞ্চলে তৎকালীন ইপিআর ক্যাম্পের সামনে অভিবাদন গ্রহণ শেষে একটি মূল্যবান ভাষণ প্রদান করেছিলেন।
(খ) ৪ জুলাই মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি আতাউল গনি ওসমানী এবং তৎকালীন সেক্টর কমান্ডার এম. কে. বাশার সহ ভারতীয় ব্রিগেডিয়ার পর্যায়ের একজন কর্মকর্তাও তাঁর সঙ্গে এসেছিলেন। অবশ্য সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খানও সঙ্গে ছিলেন। ১৭ জুলাই থেকে এম. কে. বাশার তেঁতুলিয়া মুক্তাঞ্চল সাব-সেক্টরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
(গ) মুক্তাঞ্চল পরিদর্শন ও মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশে ভাষণ দিতে এসেছিলেন অধ্যাপক ইউসুফ আলী, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, মাহবুব আলম চাষী, রাশেদ মোশাররফ, নূরে আলম সিদ্দিকী, ডা. মোজাম্মেল হক ও আবদুল লতিফ সিদ্দিকী।
(ঘ) অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে মুক্তাঞ্চলে এসেছিলেন উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম।
(ঙ) ভারতের সহায়তাদানকারী বিভিন্ন প্রদেশের নেতৃবৃন্দও এ মুক্তাঞ্চল পরিদর্শনে এসেছেন। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশংকর রায়, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী করপুরী ঠাকুর, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর উপদেষ্টা ড. ত্রিগুনা সেন, ত্রাণমন্ত্রী আর. কে. খালিদকার, পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী সন্তোষকুমার রায়, শিলিগুড়ির এমএলএ অরুণ মৈত্রসহ অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

মুক্তাঞ্চলে গণমাধ্যম ও তাঁদের প্রতিনিধিঃ মুক্তাঞ্চল তেঁতুলিয়া থানা বিদেশি সংবাদ মাধ্যমে আলোড়ন তুলেছিল। স্বাধীনতার সংগ্রামে যুদ্ধ করা মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক, বিদেশি পত্রিকাগুলোর সংবাদকর্মীরা তাঁদের লেখার সূত্রে মুক্তাঞ্চল তেঁতুলিয়ার পরিচিতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বজনমত আদায়ের জন্য এবং যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা জোগানোর জন্য বেতার ও সংবাদপত্রে সংবাদ প্রচার ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তেঁতুলিয়ার মুক্তাঞ্চলেরও সংবাদ পরিবেশন করে ভূমিকা পালন করেছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, ভারতের কলকাতার আকাশবাণী, শিলিগুড়ি ও জলপাইগুড়ির বেতার কেন্দ্র, যুক্তরাজ্যের বিবিসি, যুক্তরাষ্ট্রের ভয়েস অব আমেরিকা। এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের অমৃতবাজার, আনন্দবাজার, যুগান্তর, কালান্তর, যুক্তরাজ্যের গার্ডিয়ান পত্রিকাসহ সোভিয়েত রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ভেনেজুয়েলা, বুলগেরিয়া, রুমানিয়া প্রভৃতি দেশের সংবাদপত্র বিভিন্ন সময়ের এই মুক্তাঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পরিবেশন করেছে। মুক্তাঞ্চলে অবস্থান করে সংবাদ ও তথ্য সংগ্রহ করেছেন মার্কটালি, উইলিয়াম, ডেভিড লোশাক, হরিরা গুপ্ত, শ্রীঅরবিন্দ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য সংবাদিকগণ।

মুক্তাঞ্চলে রাজস্ব আদায়ঃ অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম পঞ্চগড় শহরের পতনের একদিন আগে তেঁতুলিয়ায় এসেছিলেন। আসার সময় তিনি শহরের হাবিব ব্যাংক, কো-অপারেটিভ ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ১৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করে নিয়ে এসেছিলেন। যা তিনি মুজিবনগর সরকারের কাছে হস্তান্তর করেন। পরবর্তীতে তেঁতুলিয়া মুক্তাঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হলে অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম-এর নেতৃত্বে মুক্তাঞ্চলের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য কন্ট্রোল রুম খোলা হয় তেঁতুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে। এ মুক্তাঞ্চলে প্রশাসন চালু হওয়ায় রাজস্ব আদায় ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়। বাজারগুলো থেকে টোল আদায়ের মাধ্যমে ব্যয় মেটানো হতো। তেঁতুলিয়া থানায় কয়েকটি স্থানে হাট বসতো সপ্তাহে এক বা দুইদিন। টোল আদায়ের উৎস ছিল হাটগুলো। উল্লেখযোগ্য হাটগুলো ছিল–তেঁতুলিয়া, শালযাহান, ভজনপুর, পাগলী হাট, রনচণ্ডি, দেবনগর, তিরনই হাট, কালান্দীগঞ্জ প্রভৃতি। বাজার থেকে আদায়কৃত টাকা প্রদান করা হতো আশ্রিতদের মধ্যে।

মুক্তাঞ্চলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাঃ মুক্তাঞ্চলে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হাপতিয়াগঞ্জের মাধ্যমে ডাক যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু রাখা সম্ভব হয়েছিল। হাপতিয়াগঞ্জের অবস্থান তেঁতুলিয়া বন্দরের পশ্চিম প্রান্তে। মহানন্দার দক্ষিণ তীর ধরে পায়ে হেঁটে মাত্র ১৫ থেকে ২০ কিমি পথ। ডাকব্যবস্থা ছাড়াও টেলি যোগাযোগ ব্যবস্থাও করা হয় মুক্তাঞ্চলে। তেঁতুলিয়ায় ছিল একটি টেলিফোন এক্সচেঞ্জ অফিস। এই টেলিফোন এক্সচেঞ্জের সাথে সংযোগ দেওয়া ছিল সরকারি অফিসগুলোতে আর সাধারণ কয়েকজন গ্রাহকের সংযোগ পাওয়ার জন্য সাহায্য নিতে হতো পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও অফিসের। এই তেঁতুলিয়া থেকে সরাসরি কল করা যেতো না। মুক্তিযুদ্ধের সময় তেঁতুলিয়া এক্সচেঞ্জ অফিসের অপারেটর পালিয়ে গেলে শিক্ষার্থী কাজী ফারুক আজম এবং তেঁতুলিয়া থানার কনস্টেবল আফাজউদ্দিন মদুল-এর সহযোগিতায় চালু রাখা সম্ভব হয়। এই এক্সচেঞ্জটি শিলিগুড়ির ডিপ হেড কোয়ার্টারের সাথে সংযোগ রক্ষা করতে গুরুত্ববহ ছিল। কারণ, শিলিগুড়ি ডিপ হেড কোয়ার্টার থেকে ফ্রন্ট লাইনের বাংকারগুলোতে টেলিফোন সংযোগের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। এই এক্সচেঞ্জ থেকে মুক্তাঞ্চলের ডাকবাংলো, বেসামরিক প্রশাসন ভবন, ফ্রন্ট লাইনের বাংকারে টেলিফোন সংযোগ দেয়া হয়। 

মুক্তাঞ্চলে চিকিৎসাব্যবস্থাঃ তেঁতুলিয়া থানা সদরে ছিল সদর থানা হেলথ কমপ্লেক্স ও দাতব্য চিকিৎসালয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর মুক্তাঞ্চলে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা-শুশ্রূষার জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়ে একটি অস্থায়ী হাসপাতালের। থানার পাশেই একটি টিনের ঘরে ১০টি বেড নিয়ে সদর থানা হেলথ কমপ্লেক্স ও দাতব্য চিকিৎসালয়ের যৌথ উদ্যোগে যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য স্থাপিত হয় ফিল্ড হাসপাতাল। পরে তা বাড়ানো হয় ৫০টি বেডে। ফিল্ড হাসপাতালটির পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন পঞ্চগড় সুগার মিলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডা. আতিয়ার রহমান। তাঁকে সহযোগিতা করেন কম্পাউন্ডার মনসুর আলী ও কম্পাউন্ডার সেলিম। মে মাসে হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। জুন মাস নাগাদ সেবাদানের জন্য আরও যাঁরা যুক্ত হন তাঁরা হলেন-শিক্ষার্থী ডাক্তার হাসিনা বানু, নার্স সালমা ও রোকেয়া এবং সহকারী তফিজ উদ্দিন।

পঞ্চগড় হেলথ কমপ্লেক্সের জিপগাড়িটি অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হতো।  অ্যাম্বুলেন্স চালক ছিলেন মো. ইউনুস। ফিল্ড হাসপাতালটির চিকিৎসা সেবায় রত ডাক্তার, নার্স ও সহকারীবৃন্দ ফিল্ড হাসপাতালের আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করা ছাড়াও যুদ্ধক্ষেত্রেও ঘুরে ঘুরে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন। ফিল্ড হাসপাতালে ঔষধ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে সাহায্য করেছেন ভারতীয় সরকার। ফিল্ড হাসপাতালটিতে প্রয়োজন অনুসারে যে সব মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা দেওয়া সম্ভব হতো না, তাঁদেরকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হতো ভারতের বাগডোগরা হাসপাতালে।

সাপ্তাহিক সংগ্রামী বাংলাঃ মুক্তিযুদ্ধে তেঁতুলিয়া মুক্তাঞ্চল থেকে মুক্তিযুদ্ধের দর্পণস্বরূপ প্রকাশিত হয়েছিল সাপ্তাহিক সংগ্রামী বাংলা নামের সংবাদপত্র। সংগ্রামী বাংলার প্রকাশক ও সম্পাদক ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও তরুণ সাংবাদিক মোঃ এমদাদুল হক। পত্রিকাটি প্রকাশের ব্যাপারে সম্পাদক নিজেই উদ্যোগী হয়ে কথা বলেছিলেন অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম, আবদুল জব্বার, কাজী হবিবুর রহমান ও শফিউদ্দিন সিদ্দিকীর সঙ্গে। পত্রিকাটি ছাপা হতো শিলিগুড়ির শ্রী আর্ট প্রেস থেকে। ট্যাবলয়েড আকৃতির দশ পয়সা মূল্যের এই পত্রিকাটি চার বা ছয় পৃষ্ঠার মুদ্রিত হতো। পত্রিকাটি প্রথম সংখ্যার প্রকাশকাল ছিল ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ এবং এর  কয়েকটি সংখ্যা নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছিল। পত্রিকাটিতে ছাপা হতো ‘যুদ্ধের খবরাখবর, গেরিলা তৎপরতা ও সাফল্যের কথা উল্লেখযোগ্য খবর সংকলিত হতো—স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, এছাড়াও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দেশীয় দোসর শান্তি কমিটি ও হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচারের ঘটনা। মুক্তাঞ্চলে পত্রিকাটি সর্বশেষ সংখ্যাটি প্রকাশিত হয় ২৩ নভেম্বর, যা ছিল ঈদ বিশেষ সংখ্যা।

তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো – মুক্তাঞ্চলে সেক্টর ও সাব-সেক্টর হেড কোয়ার্টারঃ মুক্তাঞ্চল তেঁতুলিয়ার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সকল কার্যক্রম ছিল তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো কেন্দ্রিক। তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের নীরব সাক্ষী। তেঁতুলিয়া ডাকবাংলোতে ৬ নম্বর সেক্টরের হেড কোয়ার্টার স্থাপিত হয়েছিল জুলাই মাসের শেষ দিক থেকে। সেক্টর কমান্ডার এম.কে. বাশার তখন থেকে ভারতের মিত্রবাহিনীর ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। পরে ডাকবাংলোতে এম কে বাশার বসবাস করতেন। তেঁতুলিয়া ডাকবাংলোতে প্রতিষ্ঠা পায় যুব ও ট্রানজিট ক্যাম্প।

পরবর্তীতে যুদ্ধের পরিস্থিতি ও কৌশলগত অবস্থান পাল্টানোর জন্যে হেড কোয়ার্টারের স্থান পরিবর্তন হয় রংপুরের ভুরুঙ্গামারীতে। হেড কোয়ার্টারের স্থান পরিবর্তন হলেও এম. কে. বাশার রণ-কৌশল ও প্রয়োগের জন্য যে পরিকল্পনা তা তেঁতুলিয়ার মুক্তাঞ্চলে বসেই নিতেন। এর পেছনে অন্যতম কারণ ছিল—ভারতের মিত্রবাহিনীর সঙ্গে সহজ যোগাযোগ।

মুক্তাঞ্চল তেঁতুলিয়াকে সমকালীন বাংলাদেশের রাজধানী বানানোর আকাঙ্ক্ষাও ব্যক্ত করেছিলেন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলী। ২২ সাব-সেক্টরের হেড কোয়ার্টারও তেঁতুলিয়া মুক্তাঞ্চলেই ছিল। তবে এরও স্থানান্তর ঘটে। স্থানান্তর ঘটার পেছনে দুটি কারণ বলে গবেষকবৃন্দ মত দিয়েছেন।

(১) কৌশলগত কারণ (২) মুক্তিযুদ্ধের অগ্রাভিযানের প্রয়োজনে। তবে হেড কোয়ার্টারের মতো পরিবর্তিত স্থান ভুরুঙ্গামারীতে নয়। তেঁতুলিয়ারই কাছাকাছি স্থান ভজনপুরের ব্রাহ্মণপাড়ায়। এ সময় এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষকেও অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। এ সাব সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ক্রমান্বয়ে স্কোয়াড্রন লিডার সদরুদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টেন নজরুল হক এবং বাংলার বিচ্ছু নামে খ্যাত ক্যাপ্টেন সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান।

৬/এ সাব-সেক্টর কমান্ডার স্কোয়াড্রন লিডার সদরুদ্দিন প্রথমদিকে তেঁতুলিয়া থেকেই যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। পরবর্তীকালে ভজনপুরের ব্রাহ্মণপাড়ায় হেড কোয়ার্টার স্থাপন করলেও খাদ্য ও রসদ সরবরাহ এবং যোগাযোগের জন্য তেঁতুলিয়ার ওপর নির্ভরশীল থাকতে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তেঁতুলিয়ায় অবস্থান করে এবং এখান থেকেই মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে বিভিন্ন অপারেশনে অংশগ্রহণ করে।

মুক্তিযোদ্ধা ও যৌথবাহিনীর দৃঢ়তা, দক্ষ পরিকল্পনা এবং প্রাণপণ যুদ্ধ তেঁতুলিয়া জনপদকে পাকিস্তান হানাদারদের হাত থেকে মুক্ত রাখে। মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে অন্যতম সক্রিয় সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি’র কারণেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মুক্তাঞ্চল তেঁতুলিয়াতে ঢুকতে পারেনি। মুক্তাঞ্চল তেঁতুলিয়াকে দেখে মুক্তিবাহিনীর স্বাধীনতা লাভের আকাঙ্ক্ষা উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। মুক্তাঞ্চল তেঁতুলিয়া পঞ্চগড় তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অহংকার। উল্লেখ্য যে, আজ অবধি বাংলাদেশ সরকার তেঁতুলিয়াকে ‘মুক্তাঞ্চল’-এর সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেয়নি।


তথ্যসূত্রঃ আমিনুর রহমান সুলতান | politicsupdate24.com | এস. এম. আব্রাহাম লিংকন | মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস | শফিকুল ইসলাম | মোহাম্মদ এমদাদুল হক | বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস
Last updated: 27 April 2024

Today's Weather

Recent News

Facebook Page