পঞ্চগড়ের চা শিল্প – Tea Industry of Panchagarh

পঞ্চগড়ের চা শিল্প অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। পঞ্চগড় এখন চায়ের সবুজ পাতায় ভরে উঠেছে। দুই দশক আগে শুরু হওয়া চা শিল্পের নীরব বিপ্লবে বদলে গেছে পঞ্চগড়ের অর্থনীতি। দেশের একমাত্র জেলা পঞ্চগড়, যেখানে সমতল ভূমিতে চা চাষ হয়। সমতলের চা–শিল্পে ৩০ হাজার শ্রমিক ছাড়াও রয়েছেন ৮০ হাজার ক্ষুদ্র চা–চাষি। দেশের মোট উৎপাদিত চায়ের ১৯ শতাংশই আসে পঞ্চগড় থেকে। বাংলাদেশের একমাত্র প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে ১০০ ভাগ অর্গানিক চা উৎপাদিত হচ্ছে পঞ্চগড়েই। পঞ্চগড়ের উৎপাদিত আন্তর্জাতিক মানের চা দেশের গন্ডি পেরিয়ে প্রবেশ করছে আন্তর্জাতিক বাজারে। জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে চা-বাগানের পাশাপাশি চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে ওঠায় সৃষ্টি হয়েছে কর্মসংস্থান,ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত এসেছে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে। হাজার হাজার অনাবাদি গো-চারণ পতিত জমি হয়ে উঠেছে সমতলের চা ভূ-স্বর্গ। চাঙ্গা অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পর্যটনের নতুনমাত্রা। গত তিন বছর (২০২১ হতে ২০০২৩) ধরে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে পঞ্চগড় বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চা উৎপাদনের অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। পঞ্চগড়ের চা শিল্পকে অনুসরণ করে ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, দিনাজপুর ও নীলফামারী সহ সমগ্র রংপুর বিভাগ চা উৎপাদনে হয়ে উঠেছে সমৃদ্ধ।

পঞ্চগড়ের চা শিল্পের প্রারম্ভিক ইতিহাসঃ ভারতবর্ষের চা চাষ শুরু হয় ১৮০০ শতাব্দীর প্রথম ভাগে পঞ্চগড়ের নিকটে অবস্থিত আসাম ও তৎসংলগ্ন এলাকায় এবং পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থেকে পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট চা উৎপাদনকারী দার্জিলিংয়ের দূরত্ব মাত্র ৫০ কিমি। ভারতের দার্জিলিংয়ে যদি চা চাষ হতে পারে, তাহলে পঞ্চগড়ে কেন নয়? …এই সরল প্রশ্ন থেকে শুরু।১৯৯৬ সালে প্রশ্নটি করেছিলেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পঞ্চগড়ের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ রবিউল হোসেন এটাকে শুধুই একটি প্রশ্ন হিসেবে নেননি। ভারত থেকে চারা সংগ্রহ করে তাঁর বাংলোর একটি টবে রোপণ করে চা চাষের সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করেন তিনি। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর টবের চারা দ্রুত ডালপালা ছেড়ে বাড়তে থাকে। জনাব মুহাম্মদ রবিউল হোসেনের পক্ষে তখন কল্পনাও করা সম্ভব ছিল না, টবের ওই চারাগাছের মধ্যে আসলে উঁকি দিচ্ছে পঞ্চগড়ে চা চাষের ভবিষ্যৎ।

পঞ্চগড় জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের শীর্ষস্থানীয় গবেষক ও লেখক জনাব ড. নাজমুল হক ১৯৯৮ সালে পঞ্চগড়ে চা-চাষের সূচনা করেন। ড. নাজমুল হক পঞ্চগড় মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ হিসাবে কর্মরত থাকাকালীন পঞ্চগড় মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে পঞ্চগড় জেলার প্রথম চা বাগান প্রতিষ্ঠা করেন। একই সময়ে জনাব মুহাম্মদ রবিউল ইসলামের নেতৃত্বে পঞ্চগড় জেলা প্রশাসনের তরুণ কিছু সরকারি কর্মচারীদের সাথে নিয়ে সামাজিক চা-বাগান (Social tea gardening) ধারণা (Concept) প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পঞ্চগড় জেলা সার্কিট হাউসের সামনে একটি চা বাগান করেন।

সে সফলতা থেকে পঞ্চগড়ে ১৯৯৯ সালে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা চাষের পরিকল্পনা করা হয়। সে বছরের অক্টোবরে বাংলাদেশ চা বোর্ডের প্রকল্প উন্নয়ন ইউনিট ও বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি বিশেষজ্ঞ দল পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলায় জরিপ চালিয়ে চা চাষের সম্ভাবনা সম্পর্কে নিশ্চিত হন। জরিপ কমিটি পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলায় প্রায় ৪০ হাজার একর জমিতে চা চাষের সম্ভাবনা নির্ধারণ করেন। জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ রবিউল হোসেন-কে বলা হয় পঞ্চগড় জেলার চা বিপ্লব-এর রূপকার

বাণিজ্যিকভাবে চা শিল্পের যাত্রাঃ বাংলাদেশে ১৮৫৪ সালে ব্রিটিশদের হাত ধরে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু হয় সিলেটের মালনীছড়ায়। এর প্রায় দেড়’শ বছর পর ২০০০ সালে বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু পঞ্চগড়ে। পঞ্চগড়ে ২০০০ সালে তেতুঁলিয়া টি কোম্পানি এবং পরে কাজী এন্ড কাজী টি স্টেটসহ বেশ কয়েকটি কোম্পানির হাত ধরে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু হয়। ২০০১ সালে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিটিআরআই) একটি উপকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়ে পঞ্চগড়ে মতিয়ার রহমান, সিরাজুল ইসলাম, ইসহাক আলী মন্ডল, আবদুর রহমান ও আবুল হোসেন-সহ ছয় থেকে সাতজন ক্ষুদ্র চাষি চা চাষ শুরু করেন। এরপর থেকেই বাড়তে থাকে চা চাষের পরিধি। এক সময়ের পতিত গো-চারণ ভূমি হয়ে উঠে বিস্তৃত সবুজ চা-বাগান। চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিকল্পনায় বাংলাদেশ চা বোর্ড কৃষকদের চা চাষে উদ্বুদ্ধ করতে ঋণ ও বিভিন্ন উৎসাহ প্রদান করেন। অর্থকরী সবুজ চায়ের আবাদ প্রসারে আগ্রহ বাড়তে থাকে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রান্তিক কৃষকদের।

২০০২ সাল হতে পরবর্তী এক যুগ পঞ্চগড়ে চা শিল্প প্রতিষ্ঠিত রূপ লাভ করে। পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়ার সমতলভূমিতে চা চাষ করতে দেখা যায় চাষি ও বিভিন্ন বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে। বাড়ির আশপাশে নিজ উদ্যোগে গড়ে উঠছে ছোট-বড় চা-বাগান। সড়কের পাশে বা উঁচু পতিত জমিতে কিংবা পুকুরপাড়ে এমনকি বাড়ির আঙিনায় রয়েছে চায়ের বাগান। আবার কেউ কেউ সুপারি, আম, তেজপাতা বাগানের সাথি ফসল হিসেবে করেছেন চায়ের চাষ। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে এসে বাংলাদেশ চা বোর্ড নর্দান বাংলাদেশ প্রকল্প হাতে নেয়। তেঁতুলিয়া উপজেলায় সফলতার পর পঞ্চগড়ের বিস্তীর্ণ সমতল ভূমিতে বিস্তার লাভ করে চা বাগান। সিলেট কিংবা চট্টগ্রামের উঁচু নিচু ভূমিতে চা চাষ হলেও পঞ্চগড়ের সব বাগানগুলো সাধারণত সমতল জমিতে। সমতলের চা চাষের এ সফলতা প্রভাব ফেলে দেশের গোটা চা শিল্পে।

পঞ্চগড়ে চা শিল্পের পরিসংখ্যানঃ চা বোর্ডের আঞ্চলিক কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, চা উৎপাদনে সিলেটের পর দ্বিতীয় অঞ্চল হয়ে উঠেছে পঞ্চগড় জেলা। পঞ্চগড়ে ২০০৬ সালে চা আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৯২৫ একর, যা বর্তমানে (২০২৪) ১৩ গুণ বেড়ে হয়েছে ১২ হাজার ৭৯ একর জমিতে, এখানে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় প্রায় সাড়ে ৭ হাজার চা-বাগান। নিবন্ধিত ক্ষুদ্র চা-বাগান রয়েছে ১ হাজার ১৬৮টি। অনিবন্ধিত চা-বাগান রয়েছে ৮ হাজার ৩৫৫ টি। ২০ একরের ওপরে ১৯ টি এস্টেট রয়েছে। বর্তমানে (২০২৪) পঞ্চগড় জেলায় ২৩টি চা প্রক্রিয়াজাত কারখানা চালু রয়েছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ড কর্তৃক নিবন্ধিত পঞ্চগড়ের চা বাগানের তালিকাঃ

  • কাজী এন্ড কাজী চা বাগান, বুড়াবুড়ি, তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড়।
    বাগানের পরিমাণঃ ৪১৪৯.৫৩ একর, প্রতিষ্ঠাকালঃ ২০০০
  • স্যালি লন টি ইস্টেট, ভিতরগড়, পঞ্চগড় সদর, পঞ্চগড়।
    বাগানের পরিমাণঃ ১৩৫.৫৮৫ একর, প্রতিষ্ঠাকালঃ ২০০৩
  • ডাহুক চা বাগান, বুড়াবুড়ি, তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড়।
    বাগানের পরিমাণঃ ৪৭.৯৭ একর, প্রতিষ্ঠাকালঃ ২০০৫
  • এম এম টি এস্টেটস লিঃ, পাহাড়বাড়ী, হাড়িভাষা, পঞ্চগড় সদর, পঞ্চগড়।
    বাগানের পরিমাণঃ ১০৭.৬৩ একর, প্রতিষ্ঠাকালঃ ২০০৪
  • করতোয়া চা বাগান, জগদল বাজার, পঞ্চগড় সদর, পঞ্চগড়।
    বাগানের পরিমাণঃ ১৫০.৬৭ একর, প্রতিষ্ঠাকালঃ ২০০১
  • ট্রিপল জেড চা বাগান, পঞ্চগড় সদর, পঞ্চগড়।
    বাগানের পরিমাণঃ ৭৩.১৮ একর, প্রতিষ্ঠাকালঃ ২০১৭
  • জেড এন্ড জেড চা বাগান, সরকারপাড়া, তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড়।
    বাগানের পরিমাণঃ ২৮.২৯৫ একর, প্রতিষ্ঠাকালঃ ২০১৮
  • হক চা বাগান, শালবাহান, তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড়।
    বাগানের পরিমাণঃ ১২৬.১১৫ একর, প্রতিষ্ঠাকালঃ ২০০১

 

চা উৎপাদনঃ

  • ২০০৯ সালে মোট চা উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৬.৫৯ লাখ কেজি।
  • ২০১৫ সালে চা পাতা উৎপাদন হয়েছে ২৫ লাখ কেজি।
  • ২০১৬ সালে উৎপাদন হয়েছে ৩২ লাখ কেজি।
  • ২০১৭ সালে উৎপাদন হয়েছে ৫৪.৪৬ লাখ কেজি। (মূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা)
  • ২০১৮ সালে মোট চা উৎপাদন হয়েছে ৮৪.৬৭ লাখ কেজি। (মূল্য ২০৫ কোটি টাকা)
  • ২০১৯ সালে মোট চা উৎপাদন হয়েছে ৯৫. ৯৯ লাখ কেজি।
  • ২০২০ সালে মোট চা উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৩ লাখ কেজি।
  • ২০২১ সালে মোট চা উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৪৫ লাখ কেজি।
  • ২০২২ সালে মোট চা উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৭৮ লাখ কেজি। (মূল্য প্রায় ২৮০ কোটি টাকা)

 

চা চাষিঃ ২০০৬ সালে যেখানে মাত্র এক হাজার ৪৭৫ জন শ্রমিক এই শিল্পের সাথে জড়িত ছিল, বর্তমানে তা বৃদ্ধি পেয়ে ১৫ হাজারে উন্নীত হয়েছে, নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিতভাবে এ শিল্পের সাথে বর্তমানে জেলার প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক সংযুক্ত রয়েছে। চা-পাতা বিক্রি করে ক্ষুদ্র কৃষক বছরে একরপ্রতি ২-৩ লাখ টাকা আয় করছেন, বেড়েছে সবারই জীবনমান। চা-শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। দিনে পাথর সংগ্রহ, রাতে চা-পাতা তোলেন পঞ্চগড়ের শ্রমিকেরা

নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি – সমতলের চা-বাগান ঘিরে বেকার নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। জেলার লক্ষাধিক মানুষ জড়িয়ে পড়েছেন চা শিল্পে। বেকারদের একটি বড় অংশ চাকরি ছেড়ে দিয়ে চা চাষে বিনিয়োগ করছেন। এতে করে হাজার হাজার নারী-পুরুষের কাজের কর্মসংস্থান হয়েছে। অর্থনীতিতেও স্বাবলম্বী হয়েছেন তারা। চা অর্থকরী ফসল হিসেবে বছরের নয় মাস চলে বাগানের বিভিন্ন কাজ। বাগানের পরিচর্যা হিসেবে ফ্লাইং কাটিং অর্থাৎ গাছের মাথা ফ্লাইং কাটিং, সার ও কীটনাশক স্প্রে, পানি নিষ্কাশনের কাজ করা হয়। তিন মাস বাগান পরিচর্যার পর নতুন কুঁড়ি গজে উঠে। এর মাস খানেকের মধ্যেই শুরু হয় পাতা তোলা। শ্রমিকরা বাগানে বাগানে দলবেঁধে কেজিতে ৩ থেকে ৪ টাকা চুক্তিতে পাতা তুলেন। দিন শেষে শ্রমিকদের হাতে আসে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকার মতো। পাতার দাম বাড়লে শ্রমের দামও বেড়ে যায়। এছাড়াও কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে চা কারখানাগুলোতেও।

শ্রমিক থেকে চা বাগানের মালিক – চা শিল্প ঘিরে শুধু চা চাষি ও চা শ্রমিকের অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটেনি। শ্রমিক থেকে অনেকেই হয়ে উঠেছেন চা বাগানের মালিক। নিজের জমি না থাকলেও অন্যের কাছ থেকে দীর্ঘ মেয়াদে জমি লিজ নিয়ে বাগানের মালিক হয়েছেন। অর্থনৈতিক সচ্ছলতায় বদলে গেছে আর্থ সামাজিক অবস্থা। ছনের ছাউনির জায়গায় ইট-কংক্রিটের ঘরবাড়ি। উন্নত হয়েছে গ্রামীণ পরিবেশ। আধুনিকতার শহরের আদলে গড়ে উঠছে চা গ্রাম।

চা বাগানে মিশ্র ফসল চাষে লাভবান কৃষক – সবুজ চা পাতা ছাড়াও চাষিরা চা-বাগানে মিশ্র ফসল চাষ করে লাভবান হচ্ছে। তারা চা-বাগানে এখন বিভিন্ন উন্নত প্রজাতির আম, মাল্টা, পেঁপে, সুপারি, তেজপাতা, আমলকী ও মেহগনিসহ নতুন বাগানে বিভিন্ন শাক-সবজি চাষ করে বাড়তি আয় করেছেন। গত এক দশকে চা-বাগানে এসব মিশ্র ফসল চাষ করে সফল হয়েছেন অনেক চাষি। বাগানের কাঁচা পাতা বিক্রি করে হাতে নগদ অর্থ আসার সঙ্গে সঙ্গে কৃষকের বাড়ির আঙিনাটুকুও হয়ে উঠেছে চা-বাগান।

বিশ্বের সেরা চা উৎপাদিত হচ্ছে পঞ্চগড়েঃ পৃথিবীর সেরা চা উৎপাদিত হচ্ছে এখানে। বাংলাদেশে একমাত্র প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে ১০০ ভাগ অর্গানিক চা উৎপাদন করছে কাজী অ্যান্ড কাজী টি। তাদের চা বাগান সম্পূর্ণ কম্পোজিট টি এস্টেট। আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশে অর্গানিক চা উৎপাদনে খ্যাতি পেয়েছে কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটের। এই অর্গানিক চা উৎপন্ন হয়ে বিক্রি হচ্ছে লন্ডনের হ্যারোড অকশন মার্কেটে। রপ্তানি হচ্ছে দুবাই, জাপান ও আমেরিকায়। দেশীয় বাজারে চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করেছে এখানকার চা।

চা শিল্পের প্রসারে উদ্যোগসমূহঃ উত্তরাঞ্চলে চা সম্প্রসারণের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এবং উত্তরাঞ্চলের ক্ষুদ্র চাষীদের সকল ধরনের প্রযুক্তি সহায়তা প্রদান করার উদ্দেশে বাংলাদেশ চা বোর্ড কতৃপক্ষ ২০০১ সালে পঞ্চগড়ে বিটিআরআই উপকেন্দ্র স্থাপন করে। বাংলাদেশ চা বোর্ড-এর পঞ্চগড়স্থ আঞ্চলিক কার্যালয় সব ধরনের কারিগরি সহায়তা, ভর্তুকি, ঋণের ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক স্থানীয় চাষিদের ঋণ সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসে।

চা শিল্পে স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে চা চোরা চালান রোধ ও সঠিক তথ্যপ্রাপ্তিতে টি-সফট নামে একটি সফটওয়্যার নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। সমতলের চাষ শিল্প নামে নতুন একটি মোবাইল অ্যাপ চালু করা হয়েছে। এছাড়া চা বাগান ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্রযুক্তির (যেমন ডিজিটাল হাজিরা, অনলাইন পেমেন্ট, মেশিন প্লাকিং ইত্যাদি) ব্যবহার বৃদ্ধি করা হচ্ছে। অনলাইন চা লাইসেন্স (https://tealicense.gov.bd/) সিস্টেমের মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় চা লাইসেন্স সেবা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। চা সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য ও সেবা দুটি পাতা একটি কুঁড়ি (App download link) মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে। ক্যামেলিয়া খোলা আকাশ (https://www.btbckaschool.com/) স্কুল এর মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে ক্ষুদ্র চা চাষিদের চা চাষ সম্পর্কিত সকল বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে।

চা শিল্পের অগ্রযাত্রা আরো বেগবান ও অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যে চা শিল্পের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০২৩ সাল হতে দেশে প্রথমবারের মতো জাতীয় চা পুরস্কার প্রদান করা হয়। চা রপ্তানি উৎসাহিত করতে ৪% হারে নগদ প্রণোদনা প্রদান করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশি চায়ের পরিচিতি বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক মেলা ও প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ বৃদ্ধির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম ও শ্রীমঙ্গলের পর পঞ্চগড়ে দেশের তৃতীয় নিলাম কেন্দ্র চালু হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও লালমনিরহাট থেকে উৎপাদিত চা এই নিলাম কেন্দ্রে বিক্রির পরিকল্পনায় ২০২৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর পঞ্চগড়ে দেশের তৃতীয় চা নিলাম কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের চা সংশ্লিষ্টদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হয়েছে, পঞ্চগড়ের চা নিলাম কেন্দ্র উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে উৎপাদিত চায়ের নায্য মূল্য প্রাপ্তি ও অর্থনৈতিক গতিশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নিলাম কেন্দ্র ঘিরে পঞ্চগড়ে স্থাপিত হয়েছে ব্রোকার ও ওয়্যার হাউজ।

পর্যটন শিল্পের প্রসারঃ সমতলে চা বাগান ঘিরে সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে পর্যটন শিল্পের। গ্রামীণ পর্যটন হিসেবে ইকো ট্যুরিজম ও গ্রিন ট্যুরিজমের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে কৃষিতে চা শিল্প। পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের উত্তরের সীমান্ত জনপদ পঞ্চগড়ে গড়ে উঠা চা শিল্প গ্রামীণ পর্যটনে নতুনমাত্রা দিয়েছে। চা শিল্পকে কৃষি পর্যটনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। প্রতি বছর সিলেট, মৌলভীবাজার ও চট্টগ্রামে চা-বাগান দেখতে পাড়ি দেয় লাখো পর্যটক। সিলেট-চট্টগ্রামের মতোই চা বাগান পর্যটনে নতুনমাত্রা যোগ করেছে পঞ্চগড়ে।

সম্ভাবনার পাশাপাশি পঞ্চগড়ের চা শিল্পের সংকটসমূহঃ পঞ্চগড়ে সমতল ভূমিতে চা ভূ-স্বর্গ গড়ে উঠলেও তৈরি হয়েছে নানান সংকট। এসব সংকটের মধ্যে রয়েছে চাষিদের উৎপাদিত চা পাতার ন্যায্য দাম না পাওয়ার অভিযোগ। কৃষকদের অভিযোগ, কয়েক বছর ধরেই পাচ্ছেন না চা পাতার ন্যায্য দাম। শক্তিশালী সিন্ডিকেটের জাঁতাকলে ইংরেজ নীলকরদের মতোই চুষে নেয়া হচ্ছে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য। প্রতিনিয়ত লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। উৎপাদিত চা পাতা বিভিন্ন অজুহাতে চা কারখানার মালিকরা ৪০ থেকে ৫০ ভাগ কেটে নিচ্ছেন। এতে উৎপাদনের খরচও তুলতে পারছেন না চা চাষিরা।

তবে কারখানার মালিকদের দাবি, চাষিরা কারখানায় ভালোমানের পাতা দিতে পারছেন না। দুটি পাতা একটি কুড়ি অর্থাৎ তিন পাতা থেকে সাড়ে চার পাতা পর্যন্ত বর্তমান নির্ধারিত ১৮ টাকায় কেনা যায়। কিন্তু চাষিরা বাগান থেকে কাঁচি দিয়ে কেটে ৭ থেকে ৮ পাতা পর্যন্ত নিয়ে আসায় সে দামে কেনা সম্ভব হয় না। ভালো পাতা না পেলে যেমন প্রডাকশন ভালো হবে না, সে প্রডাকশনে চা নিলাম বাজারে দাম না পেলে কৃষকদেরও ন্যায্য দাম দেওয়া সম্ভব নয়। তাই চাষিদের চায়ের উপর প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম দিয়ে যদি বাগান থেকে পাতা উত্তোলন করা যায়, তাহলে চাষি ও কারখানা উভয়ই লাভবান হলে টিকে থাকবে চা শিল্প।

অভিযোগ রয়েছে কারখানা মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে অনেক সময় সঠিক দাম পাচ্ছে না ক্ষুদ্র চাষিরা। কারখানা মালিকরা এক ধরনের দালাল তৈরি করে কাঁচা চা পাতার দাম নিয়ন্ত্রণ করছেন। ফলে অনেক সময় সকাল বিকাল পাতার দাম ওঠা-নামা করে। সরকারি নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে অধিক মুনাফা লাভের আশায় অবৈধভাবে চাষিদের ঠকাচ্ছেন কারখানা কর্তৃপক্ষ এমন অভিযোগও করেছেন অনেকে। তবে চাষিদের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। তারা বলছেন, চায়ের অকশন বিবেচনায় চা চাষিদের কাঁচাপাতার মূল্য পরিশোধ করা হয়।

পঞ্চগড় জেলার বিপুল সম্ভাবনাময় চা–শিল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য প্রয়োজন কারখানার মালিক ও চা–চাষিদের যৌথভাবে কাজ করা। পাশাপাশি প্রশাসনের উচিত বিপুল এই সম্ভাবনাময় খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে চা–চাষিদের দিকে একটু নজর দেওয়া।

…আরো পড়ুন পঞ্চগড়ের অর্গানিক চা | কাজী শাহেদ আহমেদ | আনন্দধারা রিসোর্ট | পঞ্চগড়ের শিল্প ও বাণিজ্য


তথ্যসূত্রঃ এস কে দোয়েল | তুহিন সাইফুল্লাহ | মজিবর রহমান খান | বাংলাদেশ চা বোর্ড | | Bangladesh Tea Association | Tea Traders Association of Bangladesh (TTAB) | Tea Planters and Traders Association of Bangladesh (TPTAB)
ছবিঃ এস এ সেলিম
Last updated: 26 January 2024

Share:

Facebook
Twitter
Pinterest
LinkedIn

পঞ্চগড়ে চা শিল্প