পঞ্চগড়ের বালু শিল্প – Sand Extraction

মহানন্দা, করতোয়া অববাহিকার পঞ্চগড় জেলা খনিজ পাথর-বালুতে ভরপুর একটি অঞ্চল। প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ পঞ্চগড়ের অর্থনীতিতে পাথর ও সমতলের সবুজ চা শিল্পের পর যুক্ত হয়েছে নদী কেন্দ্রিক বালু শিল্প। সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে ছোট-বড় অর্ধশতাধিক নদ-নদী। এসব নদ-নদীতে উজান থেকে আসে মূল্যবান নুড়ি পাথর, সিলিকা ও মোটা দানার বালু। সারা বছর এসব স্থান থেকে দিন-রাত চলে বালু উত্তোলনের কর্মযজ্ঞ। গুণগত মানের কারণে পঞ্চগড়ের সিলিকা ও মোটা দানার বালুর চাহিদা এখন দেশজুড়ে। এখানকার উৎকৃষ্ট মানের ঝকঝকে, মোটা ও লালচে বালি সম্পূর্ণভাবে ধুলি আর ময়লাবিহীন এবং স্বচ্ছ দানার শতভাগ পরিছন্ন।

পঞ্চগড় জেলার প্রায় ২০০ কিমি এলাকা জুড়ে রয়েছে প্রাকৃতিক এই সম্পদের ক্ষেত্র। করতোয়া, মহানন্দা, ডাহুক, চাওয়াই, করুম, ভেরসা সহ অন্যান্য নদীর বিশাল এলাকা থেকে তোলা হচ্ছে মোটা ও সিলিকা বালু। প্রতি বৈশাখে তিনটি নদীর ১৫টি বালুমহাল ইজারা দেয় প্রশাসন। করতোয়াসহ বিভিন্ন নদ-নদীর ১৫টি বালুমহাল থেকে নিয়মিত বালু তোলা হচ্ছে। এখান থেকে প্রায় ১৮ কোটি ঘনফুট বালু সরবরাহ করা হচ্ছে বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পে। এছাড়াও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে বালু বিক্রি করে সরকারের কোষাগারে জমা হচ্ছে মোটা অংকের রাজস্ব। বর্ষার প্রবল বর্ষণে দূ’কূল প্লাবনে নদীর শ্রোতের সাথে ভেসে আসে ছোট, বড় এবং মাঝারি আকারের নুড়ি পাথর আর বালু। এই বালু-পাথরেই জড়িয়ে গেছে এ উপজেলার ৫০/৬০টি গ্রামের প্রায় কয়েক হাজার মানুষের জীবন। জীবন মান উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের নানা উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে মহানন্দার এই নুড়ি পাথর আর বালু। পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলা থেকে ভজনপুর-তেঁতুলিয়া বাংলাবান্ধা এলাকা পর্যন্ত সুবিশাল এলাকার কমপক্ষে ৬০০ বালুর পয়েন্ট জুড়ে তোলা হচ্ছে মোটা দানার বালু ও সিলিকা বালু। তেঁতুলিয়ার মহানন্দা, করতোয়া, ডাহুক, জেলার সদরের মীরগড়, আমতলা, বোদা উপজেলার মাড়েয়া, তেপুখুরিয়া, বনগ্রাম বেংহাড়ি, দেবীগঞ্জের শালডাঙ্গা, দেবীডুবা এলাকায় কমপক্ষে রয়েছে এসব বালুর পয়েন্ট।

স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে প্রতিদিন এসব বালু শত শত ট্রাকে ঢাকা, বগুড়া, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, কুষ্টিয়া, মাগুরা, খুলনা সহ পাঠানো হয় দেশের বিভিন্ন জেলায়। এসব বালু বিভিন্ন স্থাপনা, সড়ক, বহুতল ভবনসহ সরকারি মেগা প্রকল্পে অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার করা হচ্ছে। দেশের কংক্রিট শিল্পে বড় ধরনের অবকাঠামো উন্নয়নে এই বালুর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। ২০২২-২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বালুর ধরণ নিরিখে ১ হাজার থেকে ১১ শত ঘনফুট বালু বিক্রি হচ্ছে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকায়। বালু ইজারাদারের অধিনে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাজার হাজার শ্রমিক নদীর হাঁটুজল থেকে বালু তুলে নৌকায় করে ঘাটে নেন। বালু তোলার সময়ই বালুভেদে আলাদা আলাদা ক্যাটাগরিতে পৃথক স্থানে রাখা হয়। সেখান থেকে ট্রলিতে করে নেয়া হয় ব্যবসায়ীদের নিজ নিজ বালু পয়েন্টে। পরে তা ট্রাকে লোড করে চলে যায় দেশের বিভিন্ন জেলায়। এসব বালুমহাল থেকে প্রতিদিন ৪শ থেকে ৫শ ট্রাক ভরে পাঠানো হয় দেশের বিভিন্ন জেলায়। একটি বড় ট্রাকে (১০ চাকা) ৮০০ থেকে সাড়ে ৮০০ ঘনফুট পর্যন্ত বালু পরিবহন করা হয়। সাম্প্রতিক বছরে বালু শিল্প ঘিরে বছরে সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪ কোটি ৩১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। এ অঞ্চলে ড্রেজার মেশিনে পাথর উত্তোলন বন্ধ হওয়ার পর বালু কেন্দ্রিক অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। নদী থেকে  বালু উত্তোলন, পরিবহন ও বালু ব্যবসায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় দুই লাখের বেশি মানুষ। একজন বালু শ্রমিক সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত আয় করেন ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত।

পঞ্চগড়ের বালু শিল্পখাতে সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব, বালু সংরক্ষণ ও বিপণনে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় পরিবেশের ক্ষতির পাশাপাশি সরকার ব্যাপকভাবে রাজস্ব হারাচ্ছে। জেলার ভূগর্ভস্থ নুড়ি পাথর এবং বিভিন্ন নদ-নদীর সিলিকা ও মোটা দানার বালু উত্তোলন, বিপণন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে সরকারি কোনো নীতিমালা নেই। এতে কিছু মানুষ বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে নামমাত্র মূল্যে ইজারা দিয়ে লাভবান হচ্ছে। বর্তমানে জমি যার, খনি তার এই নীতিতেই চলছে বালু উত্তোলন। ফলে পরিবেশ বিপর্যয় করে অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এসব সম্পদ আহরণ করায় জেলার জীববৈচিত্র্যে নানা প্রভাব পড়ছে। নদীর বালু সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে যেমন বাড়বে রাজস্ব আয়, তেমনি নদী বিধৌত অঞ্চলে গড়ে উঠা বালু কেন্দ্রীক অর্থনীতিতে যুক্ত হবে নতুন মাত্রা।

…আরো পড়ুন পঞ্চগড়ের শিল্প ও অর্থনীতি | পঞ্চগড়ের প্রাকৃতিক সম্পদ


Last updated: 10 May 2024

Share:

Facebook
Twitter
Pinterest
LinkedIn

পঞ্চগড়ের বালু শিল্প