পঞ্চগড়ের সুপারি – Betel nut of Panchagarh

দেশের প্রায় সর্বত্রই সুপারি উৎপাদন হলেও পঞ্চগড়ের সুপারি অন্যতম। পঞ্চগড়ের মাটি অপেক্ষাকৃত উঁচু এবং মাটি বেলে ও দোআঁশ হওয়ায় বংশ পরম্পরায় এখানে সুপারি চাষ করে আসছেন পঞ্চগড়ের মানুষরা। তবে সাম্প্রতিক দশকে পঞ্চগড় জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় একটা অংশ দখল করে আছে বাণিজ্যিক সুপারি উৎপাদন। পঞ্চগড়ের সুপারি আকারে অনেক বড় এবং সুস্বাদু। দাম, ফলন এবং স্বাদে আলাদা হওয়ায় পঞ্চগড়ের সুপারির সুনাম রয়েছে সারা দেশে।

পঞ্চগড়ে স্থানীয় ভাষায় সুপারির নাম হলো গুয়া। পঞ্চগড়ের মাটি এবং আবহাওয়া সুপারি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। চৈত্র, বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ এ তিন মাস সুপারির মৌসুম। এ সময়ে একদিকে গাছে সুপারি পাকা শুরু করে, অন্যদিকে নতুন করে ফুল ও ফল আসা শুরু হয়। লক্ষণীয় যে, পঞ্চগড়ে প্রতি বছর বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে সুপারি পাঁকে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ অন্যান্য অঞ্চলে এই সময়টাতে কোনো সুপারি হয় না। তাই এই সময় সারাদেশের পান-সুপারি রসিকদের চাহিদা মেটায় পঞ্চগড়ের সুপারি। রংপুরের শঠিবাড়ির সুপারি শেষ হওয়ার পর পঞ্চগড়ের সুপারি বাজারে আসে। তাই দামও থাকে বেশ চড়া। এখানকার সুপারি অন্য এলাকার চেয়ে আকার, স্বাদ ও রঙে তুলনামূলকভাবে ভালো। এ কারণে বছরজুড়েও পঞ্চগড়ের সুপারির চাহিদা রয়েছে দেশজুড়ে।

সুপারি আবাদ পঞ্চগড় জেলার অর্থনীতিতে নতুনমাত্রা যুক্ত করেছে। ২০১৭ সালে পঞ্চগড়ে সুপারি উৎপাদন হয়েছে ২ হাজার ৯৪০ মেট্রিক টন। ২০১৮ সালে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫৮২ মেট্রিক টন। ২০২২-২৩ সালে পঞ্চগড় জেলা সদর, আটোয়ারী, তেঁতুলিয়া, দেবীগঞ্জবোদা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ৬৫০ হেক্টর জমিতে সুপারি আবাদ হয়েছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পঞ্চগড়ে জেলায় প্রায় ৩০ কোটি টাকার সুপারি বেচাকেনা হয়েছে। পঞ্চগড়ে দীর্ঘকাল ধরে ধান, পাট, ভুট্টা, বাদাম, সরিষাসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন হয়ে থাকে। পঞ্চগড়ে চা চাষের সফলতার পাশাপাশি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সুপারি চাষ করা হচ্ছে। সুপারি চাষ লাভজনক হওয়ায় গত কয়েক বছর ধরে বাড়ছে এর আবাদ। একটি সুপারি গাছে ৪ থেকে ৬ পন (যথাক্রমে ৮০ থেকে ১২ হালি) পর্যন্ত সুপারি ধরে। সুপারি চাষে খরচ তেমন নেই। সার, কীটনাশক ও সেচের প্রয়োজন হয় না। সামান্য পরিচর্যা করলে এ থেকে বেশ টাকা আয় করা সম্ভব। সুপারি গাছ রোপণ পরবর্তী সামান্য পরিচর্যা করলে ২০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত ফলন ধরে। সুপারি বাগানে সাথী ফসল হিসেবে চা, চুই-ঝাল, পান, লটকন ও আদাসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা যায়। তাই একই জমি থেকে সাথী ফসলেও আসছে টাকা। সুপারি চাষে আগ্রহী করতে চাষিদের পঞ্চগড় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে সকল প্রকার সেবা প্রদান করা হয়ে থাকে।

মৌসুমের শুরু থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা পঞ্চগড়ে এসে ট্রাকে ট্রাকে সুপারি কিনে নেন। অনেক ব্যবসায়ী গ্রামে গিয়ে কৃষকদের বাড়ি থেকে সুপারি কিনেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে সুপারি কিনে তা মাটিতে খাল করে পুঁতে বা পানিতে ভিজিয়ে রাখেন। পানিতে পচানো ওই সুপারি (মজা সুপারি) শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে বেশি দামে বিক্রি করেন তাঁরা। সুপারিকে কেন্দ্র করে পঞ্চগড় জেলার ৫ উপজেলায় জমে উঠেছে সুপারির বাজার। বর্তমানে পঞ্চগড় জেলার ছোট-বড় প্রায় সব বাজারেই চলছে সুপারির জমজমাট বেচাকেনা। উল্লেখযোগ্য বাজারগুলোর মধ্যে রয়েছে জালাসী বাজার, হাঁড়িভাসা হাট, টুনির হাট, ভাউলাগঞ্জ হাট, জগদল হাট, ঝলইহাট, ফকিরগঞ্জ বাজার, ভজনপুর বাজার, ময়দানদিঘি বাজার, বোদা বাজার ইত্যাদি। সপ্তাহের নির্ধারিত দিনগুলোতে এসব বাজারে জমে ওঠে সুপারির বাণিজ্য। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বাজারগুলোতে সুপারি কেনাবেচা করে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। সুপারি উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় পঞ্চগড়ে নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে কর্মসংস্থানও।

…আরো পড়ুন পঞ্চগড়ের শিল্প ও বাণিজ্য


Last updated: 15 March 2024

Share:

Facebook
Twitter
Pinterest
LinkedIn

পঞ্চগড়ের সুপারি