ধাপঢুপ বধ্যভূমি – Dhapdhup Slaughterhouse

ধাপঢুপ বধ্যভূমি
পাঁচপীর ইউনিয়ন, বোদা, পঞ্চগড়।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পঞ্চগড় জেলার সবচেয়ে বড় গণহত্যার ঘনাটি ঘটেছিল বোদা উপজেলার পাঁচপীর ইউনিয়নের ইসলামপুর এলাকার ধাপঢুপ বিলের পাড়ে। বিলের দক্ষিণ পাড়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে ধাপঢুপ গণহত্যার স্মৃতিফলক। ধাপঢুপ গণহত্যা পঞ্চগড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দালালদের নির্মমতার এক বড় সাক্ষী। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই ১৯৭১ সালের ২৩ এপ্রিল শুক্রবার পৈশাচিক পাকিস্তানি বাহিনী স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় ধাপঢুপ বিলের পাড়ে প্রায় ৩৫০০ মানুষকে গুলি করে ও কোদাল দিয়ে কেটে নির্মমভাবে হত্যা করে। স্বাধীনতার ইতিহাসের নির্মম সেই ক্ষনে অগুনতি মানুষের রক্তে ভরে উঠেছিল ধাপঢুপ বিল।

স্বাধীনতার প্রাক্কালে বাঙালি হিন্দুদের উপর নির্বিচার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ভারতে পালিয়ে যাচ্ছিলো বোদা উপজেলার শুকানপুকুরী, জাঠিভাঙ্গা, পাঁচপীর, জগন্নাথপুর, সালন্দর, জমাদার, সিপাইপাড়া, নয়াদীঘি, কাজলদিঘী, সাতখামার, কাজীপাড়া ও শিবকাঠি এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বী কয়েক হাজার মানুষ। যাত্রা পথে পাকিস্তানী সেনাদের আগমনের খবর পেয়ে তাঁরা ঠাকুরগাঁও সদরের জাঠিভাঙ্গা বাজারের কাছে পাথরাজ নদীর তীরবর্তী একটি আমবাগানে এসে লুকিয়ে থাকে। কিন্তু স্থানীয় রাজাকাররাদের মাধ্যমে পাকিস্তানী সেনারা তা জেনে যায় এবং কয়েকটি ট্রাক সৈন্য এনে আমবাগানটি ঘিরে ফেলে।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরের প্রথমেই মহিলাদেরকে আলাদা করে তাঁদের উপর অমানবিক অত্যাচার শুরু করে। এরপরে পুরুষদেরকে জড়ো করে নির্জন ধাপঢুপ বিল পাড়ে। নিরপরাধ পুরুষদেরকে লাইন করে দাঁড় করিয়ে পেছন দিক থেকে ব্রাশফায়ার করা হয়। শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলি লেগে সবাই লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। এদের মধ্যে যাঁদের কে জীবিত মনে হয়েছে তাঁদেরকেকে পুনরায় ধারালো অস্ত্র, কোদাল দিয়ে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেছে পৈচাশিক পাকিস্তানী সেনারা। এরপরও কয়েকজন মরে যাওয়ার ভান করে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। এদের দুজন সপেন্দ্রনাথ রায় ও বোদা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার ললিত মোহন রায়। তাঁদের দুজনের বর্ণনায় জানা যায়, গুলি লাগার পরেও যারা বেঁচে ছিলেন তাঁদের ধারাল অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাঁদের চিৎকার এলাকার আকাশ-বাতাস ভারি করে তুললেও নিরীহ মানুষগুলোকে বাঁচাতে এগিয়ে আসার কোনো মানুষ ছিল না ওই এলাকায়। একে একে তাঁদের লাশ ঢাপঢুপ বিলে ফেলে লাশের ওপর সামান্য মাটি ছিটিয়ে দেওয়া হয়। বিলের কাদামাখা পানির রং হয়ে যায় লাল।

সপেন্দ্রনাথ রায়

২৪/২৫ বছরের যুবক সপেন্দ্রনাথ রায় ডান বাহুতে গুলি আর কাঁধে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে অজ্ঞান হয়ে লাশের স্তুপে পড়ে থাকায় ঘাতকরা মনে করেছিল তিনিও মারা গেছেন । হত্যাকান্ডের প্রায় ঘন্টা খানেক পর সপেন্দ্র নাথের জ্ঞান ফিরে এলে স্থানীয় কয়েকজনের সহায়তায় পালিয়ে যান ভারতে। ঢাপঢুপ বিলে ক্ষেত্র মোহন, থেপু বর্মন, শীতেন চন্দ্র, মলিন চন্দ্র নামের আরও ৪ জন শরীরে ক্ষত নিয়ে প্রাণে বাঁচলেও তাঁরা জীবিত ছিলেন না বেশিদিন। ভারতে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন সপেন্দ্রনাথ। দুঃসহ সেই স্মৃতি বয়ে বেড়ানোর কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন সপেন্দ্রনাথ। তিনি বলেন, ‘ধাপঢুপের গণহত্যার কথা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। সারি সারি লাশ পড়ে আছে। গরু-ছাগলের মতো মানুষকে জবাই করে হত্যা করা হচ্ছে। আমার ঘাড় ও মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। একটি গুলি আমার ঘাড়ের নিচে লাগে। মৃত ভেবে ওরা আমাকে ফেলে দিয়েছিল। এই গ্রামে কোনো পুরুষ ছিল না। সবাইকে মেরে ফেলা হয়েছিল সেদিন। শুধু নারীরা আর তাদের কোলে থাকা শিশুরা বেঁচে ছিল।

সেদিন ধাপঢুপে বোদা উপজেলার পাঁচপীর ইউনিয়নের শুকানপুকুরী গ্রামের বালাশ্বরীর স্বামী-সন্তানকে হত্যা করে পাকিস্তানিরা। তখন তিনি ৩ মাসের গর্ভবতী। চোখের সামনেই বিলের পানিতে স্বামী-সন্তানের লাশ ভেসে থাকতে দেখেছেন বালাশ্বরী। পরে তিনি স্বামীর ভিটে ছেড়ে আশ্রয় নেন ভারতের শরণার্থী ক্যাম্পে। সেখানে তাঁর একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। স্বাধীনতার পর স্বামীর ভিটেতে ফিরে কোনোমতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধে ঢাপঢুপ বিল থেকে পাঁচশো গজ দক্ষিণে শুকানপুকুরীসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় প্রায় ২৫০ নারী বিধবা হন। হিন্দু অধ্যুষিত ওই গ্রামটিতে মৃত্যুর সংখ্যা এত বেশি ছিল যে শুকানপুকুরী গ্রাম বিধবা পল্লী বা বিধবা গ্রাম হিসেবে পরিচিতি পায়। অল্প বয়সে বিধবা হওয়া ওই নারীদের আর বিয়েও হয়নি। ফলে তাঁদের কাছে সংসার বলতে কিছুদিনের স্মৃতি মাত্র। একাত্তরে স্বামীহারা নারীদের দু-একজন বাদে বর্তমানে (২০২৪) অধিকাংশই মারা গেছেন।

ধাপঢুপ গণহত্যার স্মৃতিফলক দেখে চেনা যায় ধাপঢুপ বিল। শুকনো মৌসুমে বিলটি খালে পরিণত হলেও বর্ষায় পানিতে পূর্ণ থাকে। বছর দশেক আগে এখানকার খাল খনন করতে গিয়ে মানুষের অসংখ্য হাড় পাওয়া যায়। ২০১১ সালে জেলা প্রশাসক বনমালী ভৌমিক এবং জেলা পরিষদের উদ্যোগে এই বধ্যভূমিটি সংরক্ষণের জন্য স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়। বধ্যভূমির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বাবু সপেন্দ্রনাথ। বর্তমানে (২০২৪) অযত্ন-অবহেলায় বধ্যভূমির জীর্ণদশা চোখে পড়ে। রাস্তা থেকে ৩০ ফুট দূরে কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে স্মৃতিস্তম্ভটি। বধ্যভূমিতে যাওয়ার মাটির আইলসদৃশ্য রাস্তাটির অবস্থাও করুণ। বধ্যধভূমি স্মৃতিস্তম্ভে লেখা আছে, ‘স্বাধীনতার প্রাক্কালে পাকিস্তানি হানাদারদের নির্মম অত্যাচার হতে বাঁচার তাগিদে ভারতে গমনরত প্রায় ৩৫০০ লোককে দেশীয় রাজাকারদের সহায়তায় হত্যা করে এই পুকুরে তাঁদের লাশ ফেলে দেওয়া হয়।’ ভিত্তিফলকে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের বিখ্যাত পংক্তি …দাঁড়াও পথিকবর, জন্ম যদি তব, বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এ সমাধি স্থলে… লেখা থাকলেও ফলকটির সামনে পথিকেরা কদাচিৎই দাঁড়ান।

ঢাপঢুপ গণহত্যায় পাকিস্তানিদের দোসর হিসেবে সহযোগিতা করে বালিয়া ইউনিয়নের কলনী পাড়ার আহম্মদ আলী, ধাপঢুপ গ্রামের এরশাদ আলী, মোঙ্গলু, মহিউদ্দীন সহ অনেকে।

অবস্থানঃ পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলা থেকে প্রায় ৯ কিমি দূরে পাঁচপীর ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামে বোদা-পাঁচপীর সড়কের পাশে ধাপঢুপ বধ্যভূমির অবস্থান।

ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের পর দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও পরিকল্পনা অনুযায়ী ধাপঢুপ স্মৃতিস্তম্ভ বা স্মৃতিসৌধ আজও (২০২৪) নির্মিত হয়নি। নিহতদের পরিচয় ও প্রকৃত সংখ্যা থেকে গেছে আজও অজানা। এখনো বিলের পাশের জমি চাষ করার সময় মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসে মানুষের হাড়গোর, মাথার খুলি। স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস আগামী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে বধ্যভূমিটি সংরক্ষণ করা অতীব জরুরি।

…আরো পড়ুন পঞ্চগড়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন, বধ্যভূমি ও গণকবর | পঞ্চগড়ের তালিকাভুক্ত শহীদ মুক্তিযোদ্ধাপঞ্চগড়ের সকল মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা

 


তথ্যসূত্রঃ ড. নাজমুল হক । আল ফরিদ | রাজিউর রহমান রাজু
ভিডিওঃ JHINAY KURY
ছবিঃ যাকারিয়া ইবনে ইউসুফ | রাজিউর রহমান রাজু
Last updated: 20 April 2024

Share:

Facebook
Twitter
Pinterest
LinkedIn